অনলাইন টিকিটের ফাঁদে ব্যাহত স্বাস্থ্যসেবা

রোগীদের সুবিধার্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষ অনলাইনে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা চালু করে ১ সপ্তাহ আগে।

এরই মধ্যে এ প্রক্রিয়াকে বাণিজ্যিকীকরণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী। এতে ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়েছে চিকিৎসাসেবা।

রোগীদের আগের দিন অনলাইনে টিকিট করে আসতে হয় হাসপাতালে। এর ফলে দূর-দূরান্ত থেকে জটিল ও জরুরি রোগ নিয়ে আসা রোগীরা তাৎক্ষণিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রেণির অসাধু কর্মী অনলাইনেও টিকিট বিক্রি জটিল করে ফেলেছে। আবার কাউন্টারেও টিকিট বিক্রি করছে না। টিকিটের জন্য গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা, অনেক রোগীকে ফিরে যেতে হচ্ছে চিকিৎসা না নিয়েই।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে তথ্য প্রদান করলে উক্ত ব্যক্তির মোবাইল ফোনে একটি খুদেবার্তা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকিট কাউন্টারে সেটি দেখালে ৩০ টাকার বিনিময়ে মিলবে টিকিট। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অশিক্ষিত মানুষ অনলাইনের এ টিকিটিং ব্যবস্থা বোঝেন না। তাদের জন্য কাউন্টারে বা অফলাইনে টিকিট রাখার কথা বলা হলেও তা সকালে ২০-২৫ মিনিট খোলা রাখার পর বন্ধ করে দেয়া হয়।

ইতিপূর্বে রেফারেন্সে চিকিৎসকদের চেম্বারে এ ধরনের রোগীকে দেখা হতো। এখন সেটাও দেখা হচ্ছে না। এদিকে অতিরিক্ত টাকা দিলে মিলছে টিকিট। সব মিলিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা অনলাইন টিকিট ফাঁদে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক বলেন, স্বাভাবিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগে গড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার রোগী টিকিট কেটে সেবা গ্রহণ করে থাকেন।

কোভিডকালীন সময়ে যা আড়াই থেকে ৩ হাজারে নেমে আসে। কিন্তু এ অনলাইন টিকিট গ্রহণ ব্যবস্থা চালুর পর রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে কমতে শুরু করেছে।

তারা বলেন, এটি কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সেবা প্রতিষ্ঠান। এখানে আসা রোগীদের ৭৫ শতাংশই রাজধানীর বাইরে থেকে আসেন। হাসপাতালের টিকিট সিনেমা হলের মতো কালোবাজারে বিক্রি হওয়া দুঃখজনক এবং অমানবিক। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা স্বল্প শিক্ষিত, দরিদ্র এবং রাজধানীর বাইরে থেকে চিকিৎসার জন্য আসেন তাদের ক্ষেত্রে অনলাইন টিকিটের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।

এছাড়া যারা এটাকে নিয়ে দুর্নীতি শুরু করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো এর দায়ভার বর্তমান প্রশাসনের ওপর বর্তাবে।

রাজধানীর মহাখালী এলাকা থেকে পাইলস ও ফিস্টুলার সমস্যা নিয়ে বুধবার হাসপাতালে বহির্বিভাগে গিয়েছিলেন তিতুমীর কলেজের ছাত্র শামিম ইসলাম। কয়েকদিন ধরে তীব্র ব্যথা ও যন্ত্রণায় ভোগা এ রোগী টিকিটের জন্য গেলে প্রথমে জানিয়ে দেয়া হয় বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। এরপর তিনি ভিসি অফিসে যান।

সেখানেও প্রতিকার পাননি। বহির্বিভাগে গিয়ে এক দালালের কাছ থেকে ৩০ টাকার টিকিট ১৭০ টাকায় কিনতে হয় তাকে। এরপর শামীম চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার সুযোগ পান।

বরিশাল থেকে স্ত্রীকে নিয়ে আসা আয়নাল হোসেন বলেন, অনলাইন টিকিটিং মূলত একটা ধাপ্পাবাজি। তিনি তার স্ত্রীর প্রসূতি সেবার জন্য আসেন। কিন্তু কাউন্টারে গিয়ে টিকিট চাইলে বলা হয় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি এ সময় উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানান, সেবা ডিজিটাল করার নামে অনলাইনে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দেশের সামাজিক বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এখনও দেশের অধিকাংশ মানুষ অনলাইন কার্যক্রম বোঝেন না। বিষয়টি পর্যাপ্ত প্রচারের ব্যবস্থাও করা হয়নি।

এসব কারণে আগে থেকে টিকিট না করেই মানুষ চলে আসছেন চিকিৎসাসেবা নিতে। ফলে অনলাইনে টিকিট করতে পারছেন না অনেকেই।

আবার এসব রোগীর জন্য কাউন্টারে (অফলাইনে) টিকিট রাখার কথা বলা হলেও সকাল ৮টার দিকে ২০ থেকে ২৫ মিনিটের জন্য খোলা হয় কাউন্টার।

কিন্তু তখন রোগীর চেয়ে দালাল থাকে বেশি। ফলে গরিব-অসহায় রোগীদের উচ্চদরে টিকিট কিনতে হয়। পাশাপাশি টাকা খরচ করতে না পারা রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন চিকিৎসাসেবা থেকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউরোসার্জন অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, মানুষের ভোগান্তি কমাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না বলে রোগী ফিরে যাচ্ছেন এমন ঘটনা তার জানা নেই। তিনি বিষয়টি খোঁজ নেবেন জানিয়ে বলেন, যদি এটি নিয়ে কারসাজির ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া হবে।

১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগের অনলাইনে সেবাপ্রাপ্তির বিষয়টি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করেন প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তা। ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা প্রদান সহজতর করার লক্ষ্যে এবং করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করতে অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেমের উদ্বোধন করেন। সেখানে আরও বলা হয়, সরাসরি টিকিট কেটে সিরিয়াল নেয়ার পাশাপাশি অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে সিরিয়াল গ্রহণ করা যাবে।

এক্ষেত্রে নির্ধারিত দিনের একদিন পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট www.bsmmu.edu.bd থেকে সিরিয়াল গ্রহণ করতে হবে। অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে সিরিয়ালপ্রাপ্ত রোগীরা অগ্রাধিকার পাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *